ক্রিকেটকে যদি একটা মহাকাব্য ধরা হয়, তবে সেই কাব্যের সবচেয়ে জাদুকরী অধ্যায়ের নাম স্যার গ্যারফিল্ড সেন্ট অবার্ন সোবার্স—সংক্ষেপে স্যার গ্যারি সোবার্স। ক্রিকেট মাঠে তিনি যা করেছেন, তা একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক ক্রিকেটেও অনেকের জন্য কল্পনাতীত। ব্যাটিং, বোলিং, ফিল্ডিং কিংবা নেতৃত্ব—ক্রিকেটের প্রতিটি ব্যাকরণকে তিনি যেভাবে নিজের হাতের মুঠোয় পুরেছিলেন, তাতে তিনি কেবল কিংবদন্তি নন, বরং কিংবদন্তিদেরও কিংবদন্তি।
ক্রিকেট ইতিহাসে স্যার গ্যারি সোবার্সের মতো সম্পূর্ণ বা ‘কমপ্লিট ক্রিকেটার’ আর দ্বিতীয় কেউ আসেনি। স্যার ডন ব্র্যাডম্যানের ব্যাটিং গড় অলৌকিক হতে পারে, কিন্তু সোবার্স ছিলেন ক্রিকেট ঈশ্বরের এমন এক সৃষ্টি যিনি একাই একটি আস্ত দলের ভূমিকা পালন করতে পারতেন।
ব্যাটসম্যান সোবার্স: টেস্টে ৩৬৫ রানের সেই মহাকাব্যিক ইনিংস তো আছেই, ক্যারিয়ার শেষে যার ব্যাটিং গড় ছিল ৫৭.৭৮।
বোলার সোবার্স: তিনি যখন যেভাবে চেয়েছেন বল করতে পারতেন। একই ম্যাচে কখনো বাঁহাতি ফাস্ট-মিডিয়াম বোলিংয়ে ব্যাটসম্যানদের পরাস্ত করেছেন, আবার প্রয়োজন হলে বলের গতি কমিয়ে হয়ে উঠেছেন নিখুঁত চতুর চায়নাম্যান বা অর্থোডক্স স্পিনার। ক্যারিয়ারের ২৩৫টি টেস্ট উইকেট তার এই বহুমুখী প্রতিভার প্রমাণ দেয়।
ফিল্ডার ও অধিনায়ক: সিলি পয়েন্টে ক্যাচ নেওয়ার ক্ষেত্রে তার ক্ষিপ্রতা ছিল চিতাবাঘের মতো। আর অধিনায়ক হিসেবে ক্যারিবীয় ক্রিকেটকে দিয়েছিলেন এক আগ্রাসী ও লড়াকু চরিত্র।
১৯৬৮ সালের ৩১ আগস্ট। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে নটিংহামশায়ারের হয়ে গ্ল্যামারগনের ম্যালকম ন্যাশের এক ওভারে ৬টি ছক্কা মেরে ক্রিকেট বিশ্বে তোলপাড় সৃষ্টি করেছিলেন সোবার্স। আধুনিক ক্রিকেটের টি-টোয়েন্টি যুগে এসেও যা এখনো ব্যাটারদের জন্য পরম আরাধ্য এক স্বপ্ন, সেই কীর্তি তিনি গড়েছিলেন আজ থেকে প্রায় ছয় দশক আগে।
আজকের দিনে ক্রিকেট অনেক বেশি স্পেশালাইজড। পাওয়ার হিটিংয়ের জন্য আলাদা ব্যাটার, ডেথ ওভারের জন্য আলাদা বোলার। কিন্তু সোবার্স প্রমাণ করেছিলেন, প্রতিভা যদি আকাশচুম্বী হয় তবে এক শরীরেই ধারণ করা যায় ক্রিকেটের সব রঙ। ক্রিকেট পন্ডিতদের মতে, ডন ব্র্যাডম্যানের পর যদি ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী কোনো নাম বেছে নিতে হয়, তবে সেটি নিঃসন্দেহে স্যার গ্যারি সোবার্স।
যুগ আসবে, যুগ যাবে। ক্রিকেটের রেকর্ডবুক ওলটপালট হবে প্রতিনিয়ত। কিন্তু সবুজ গালিচায় রোদ ঝলমলে এক দুপুরে কলার খাড়া করে ব্যাট হাতে বাইশ গজ কাঁপানো সেই বাঁহাতি জাদুকর স্যার গ্যারি সোবার্স চিরকাল থেকে যাবেন অনন্তলোকে—সব প্রজন্মের কিংবদন্তিদের আদর্শ হয়ে।

