ভারতের পার্লামেন্টে সম্প্রতি দেখা গেছে এক নজিরবিহীন দৃশ্য। কয়েক দশক ধরে চলে আসা পার্লামেন্টের ভাষার গাম্ভীর্যের মধ্যে হঠাৎ ঢুকে পড়েছে ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়া সংস্কৃতিতে জনপ্রিয় কিছু ‘জেন-জি’ কোড-ওয়ার্ড।
‘ডেলুলু’ (বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন), ‘ফোমো’ (পিছিয়ে পড়ার ভয়) কিংবা ‘ক্লকড ইট’ (সঠিক সময়ে ধরে ফেলা)-এর মতো শব্দগুলো এখন ভারতের আইনপ্রণেতাদের মুখে মুখে। সাধারণ ইনস্টাগ্রাম, মেসেঞ্জার বা মিম পেজের এসব শব্দ বিশেষ করে পরীক্ষা সংক্রান্ত অনিয়ম ও প্রশ্নফাঁস নিয়ে বিতর্কের সময় পার্লামেন্টে সোচ্চার হয়ে ওঠে।
তবে পার্লামেন্টের এই দৃশ্যমান আধুনিকতার আড়ালে দৃশ্যমান এক গভীর বৈপরীত্য—একদিকে আইনসভায় তরুণদের ভাষা ব্যবহার করে তাদের সাথে সংযোগ তৈরির চেষ্টা, অন্যদিকে রাজপথে নামা সেই তরুণদের ওপরই নামানো হচ্ছে পুলিশি লাঠিচার্জ, ধরপাকড় ও আইনি মামলা।
পার্লামেন্টে বর্ষীয়ান নেতাদের মুখে এসব শব্দের আগমন কোনো আকস্মিক আমুদে ঘটনা নয়; এর পেছনে রয়েছে সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ এবং রিল, শর্টস ও ভাইরাল ক্লিপ তৈরির সুপরিকল্পিত পিআর (Public Relations) কৌশল।
শিবসেনার প্রয়োগ: শিবসেনার শ্রীকান্ত শিন্দে যখন বিরোধীদের পার্লামেন্টে অনুপস্থিত থাকার জন্য ‘এমআইএ’ (Missing in Action), ট্রেন্ড হাতছাড়া হওয়ার ভয়ে ‘ফোমো’ এবং বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন বোঝাতে ‘ডেলুলু’ আখ্যা দেন, তখন শব্দগুলোর সচেতন নির্বাচন স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
বিজেপির অবস্থান: শাসক দল বিজেপির বাঁশুরি স্বরাজ দাবি করেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রশ্নফাঁসবিরোধী আইন এনে বিষয়টি একেবারে ‘ক্লকড ইট’ করেছেন।
বিরোধীদের ট্রেন্ডে ভাসা: বিরোধী নেত্রী সুপ্রিয়া সুলে শুরুতে ‘আমরা কেন জেন-জিদের ভাষায় কথা বলছি?’ বলে বিস্ময় প্রকাশ করলেও, কিছুক্ষণ পর তিনিও প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করতে ‘ডেলুলু’ শব্দটি ব্যবহার করেন।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রাহুল ভার্মা মনে করেন, ভোটারদের সঙ্গে সংযোগ তৈরিতে রাজনীতিবিদরা অতীতে বলিউডের সংলাপ (যেমন—‘হাও ইজ দ্য জোশ’) বা ক্রিকেটের অনুকরণ করলেও, আজকের জেন-জি স্ল্যাং সেই কৌশলেরই ডিজিটাল রূপ। তবে ডিজিটাল নৃবিজ্ঞানী পায়েল আরোরার মতে, তরুণদের প্রাত্যহিক জীবনের ভাষা কেবল নকল করলেই নীতিগত পরিবর্তন আসে না; বরং তরুণদের কাছে এই ফাঁপা পিআর প্যাকেজিং ‘ক্রিঞ্জ’ বা মেকি বলেই মনে হয়।
পার্লামেন্টের চটকদার জেন-জি ভাষার সম্পূর্ণ বিপরীত ও নির্মম ছবি দেখা যায় দেশটির রাজপথে।
ভারতের লাখ লাখ তরুণ এখন ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা, তীব্র বেকারত্ব এবং একের পর এক সরকারি নিয়োগ ও ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস কেলেঙ্কারির মুখোমুখি। এই পুঞ্জীভূত ক্ষোভ থেকে জন্ম নেওয়া সোশ্যাল মিডিয়া-ভিত্তিক ও রাজপথে সক্রিয় ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)-র মতো তরুণদের আন্দোলন দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল। লাখ লাখ শিক্ষার্থী রাজপথে নেমে আসার পর এই আন্দোলন সরকারের ওপর নজিরবিহীন চাপ সৃষ্টি করে।
একদিকে তরুণদের আকর্ষণে পার্লামেন্টে জেন-জি ভাষা ধার করে আধুনিকতার পোশাক পরা হচ্ছে, আর অন্যদিকে সেই তরুণদের যৌক্তিক দাবি ও ক্ষোভ সামলাতে ব্যবহার করা হচ্ছে রাষ্ট্রের কঠোর পুলিশি শক্তি। রাজনৈতিক নেতাদের এই দ্বিমুখী আচরণই আজ ভারতের সমকালীন রাজনীতি ও নীতিনির্ধারণের বড় সংকটকে সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে।

