প্রশ্নপত্র ফাঁস ও শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি নির্যাতনের প্রতিবাদে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনরত শিক্ষার্থী ও বিরোধী দলগুলোর সংঘাত তীব্র রূপ নিয়েছে। রাজধানী দিল্লির যন্তর মন্তরে আন্দোলনরত ছাত্রসমাজের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন এক নজিরবিহীন পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। অন্যদিকে, বিরোধীদের তীব্র হট্টগোল ও শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে টানা তৃতীয় দিনের মতো অচল হয়ে পড়েছে ভারতীয় সংসদের উভয় কক্ষের অধিবেশন।
কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের প্রতিটি দাবিকে পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে বলেছেন, গত এক দশকে ১৫৪টি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটলেও একজন অপরাধীকেও সাজা দেওয়া হয়নি। ম্যানিফেস্টো ও সংবাদ সম্মেলনে তিনি স্পষ্ট করেন, “শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান চরম দুর্নীতিগ্রস্ত ও অযোগ্য। ছাত্রসমাজ তাঁর অপসারণ এবং প্রধানমন্ত্রীর কাছে ক্ষমা প্রার্থনার যে দাবি জানিয়েছে—তা সম্পূর্ণ ন্যায্য। শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতনকারীদের কঠোর শাস্তি দিতে হবে। কংগ্রেস তাঁদের সব দাবির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করছে।”
দিল্লির যন্তর মন্তরে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে অনড় হাজার হাজার শিক্ষার্থী টানা বৃষ্টি উপেক্ষা করে অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন। একপর্যায়ে দিল্লি পুলিশ আন্দোলন দমাতে বিদ্যুৎ-সংযোগ বিচ্ছিন্ন এবং খাবার ও পানীয় প্রবেশের ওপর কড়াকড়ি আরোপ করে। তবে এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ ও বিভিন্ন পেশাজীবীরা অভাবনীয়ভাবে এগিয়ে আসেন।
দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে সুইগি, জোম্যাটো ও ফুডপান্ডার মতো অনলাইন ফুড ডেলিভারি অ্যাপের মাধ্যমে যন্তর মন্তরে খাবার ও বিশুদ্ধ পানি পাঠাতে শুরু করেন। স্থানীয় বাসিন্দারাও বিনামূল্যে চা, ফল ও রান্না করা খাবার বিতরণ করেন। পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায় যে, অতিরিক্ত খাবারের জোগান সামলাতে আন্দোলনকারী ছাত্রনেতারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আপাতত খাবার না পাঠাতে অনুরোধ জানাতে বাধ্য হন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা দিল্লির এই গণউচ্ছ্বাসকে বাংলাদেশ, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার সাম্প্রতিক ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানের সঙ্গে তুলনা করছেন।
বুধবার সকালে রাহুল গান্ধী ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধীসহ বিরোধী দলগুলোর সংসদ সদস্যরা কালো পোশাক পরে সংসদ ভবনে উপস্থিত হন এবং চত্বরে সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। পরবর্তীতে লোকসভা ও রাজ্যসভায় বিরোধী দলগুলো শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে মুলতবি প্রস্তাব আনলে এবং হট্টগোল করলে স্পিকার ও চেয়ারম্যান দুই কক্ষেরই অধিবেশন সারা দিনের জন্য মুলতবি ঘোষণা করেন।
সরকারের পক্ষ থেকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে পি নাড্ডা এবং প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয়ের মন্ত্রী জিতেন্দ্র সিং আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনার প্রস্তাব দিলেও ছাত্রনেতারা তা প্রত্যাখ্যান করেন। ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) মুখপাত্র সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাংকা স্পষ্ট জানান, “মন্ত্রীদের বাসভবনে আলোচনা হবে না; আলোচনা হতে হবে যন্তর মন্তরে কিংবা কোনো নিরপেক্ষ স্থানে। ২০ জুলাই যা হয়েছে তা ছিল কেবল ‘ট্রেলার’, সরকার দাবি না মানলে এবার দেশের লাখ লাখ মানুষ দিল্লি স্তব্ধ করে দেবে।”
দিল্লি হাইকোর্ট সম্প্রতি শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি নির্যাতনের নানা অভিযোগের প্রেক্ষাপটে দিল্লি পুলিশকে কঠোর ভর্ৎসনা করেছেন। আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, সিসিটিভি ফুটেজসহ সব নথিপত্র অক্ষত রাখতে হবে। বিচারপতিরা মন্তব্য করেন, “শিক্ষার্থীদের ওপর এই নির্যাতন পুরো দেশের বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছে।”
অন্যদিকে, ক্ষমতাসীন বিজেপি এই আন্দোলনের পেছনে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র রয়েছে বলে দাবি করেছে। তাঁদের অভিযোগ, পাকিস্তান, খালিস্তানি গোষ্ঠী এবং মার্কিন ধনকুবের জর্জ সোরসের মতো বিদেশি শক্তি নরেন্দ্র মোদির স্থিতিশীল সরকারকে অস্থিতিশীল করতে যুবসমাজকে ব্যবহার করছে। তবে বিরোধীরা এই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে সারা দেশে আন্দোলন আরও বেগবান করার ঘোষণা দিয়েছে।

