ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় ইতিমধ্যে ৩ হাজার ৭৫০ কোটি (৩৭.৫ বিলিয়ন) ডলারে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছেন দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। ইরানে নতুন করে ভারী বোমাবর্ষণ শুরু হওয়ার পর মঙ্গলবার প্রথমবারের মতো কংগ্রেসের মুখোমুখি হয়ে এই তথ্য দেন তিনি। মূলত ক্রমবর্ধমান এই অজনপ্রিয় যুদ্ধ অব্যাহত রাখতে জরুরি অতিরিক্ত তহবিল চাওয়ার লক্ষ্যেই আইনপ্রণেতাদের সামনে উপস্থিত হন পেন্টাগনপ্রধান।
আগামী নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচন। এতে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটে নিজেদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টিকে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। অন্যদিকে জনমত জরিপে বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে থাকা ডেমোক্র্যাটরা এই যুদ্ধের বিশাল খরচের সঙ্গে সাধারণ নাগরিকদের জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির বিষয়টিকে মূল ইস্যু বানিয়ে প্রচার চালাচ্ছে।
গত মাসেই কংগ্রেসের কাছে অতিরিক্ত প্রায় ৯ হাজার কোটি ডলারের জরুরি বাজেট দাবি করেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, যার সিংহভাগই ইরান যুদ্ধ পরিচালনার জন্য নির্ধারিত। একদিকে যুদ্ধ নিয়ে আইনপ্রণেতাদের ক্রমবর্ধমান ক্ষোভ, অন্যদিকে ঘনিয়ে আসা নির্বাচন—সব মিলিয়ে এই তহবিল অনুমোদনকে কেন্দ্র করে ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে কংগ্রেসের সংঘাত তুঙ্গে পৌঁছেছে।
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে হামলা শুরু করে। কিন্তু সংঘাতের সামরিক কৌশল বা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন তাঁদের অন্ধকারে রেখেছে বলে শুরু থেকেই অভিযোগ করে আসছেন রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট উভয় পক্ষেরই আইনপ্রণেতারা।
শুনানিতে সিনেটের বরাদ্দবিষয়ক কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট সদস্য প্যাটি মারে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,
“প্রেসিডেন্ট লাগাতার সংঘাত বাড়িয়ে চলছেন এবং বেসামরিক স্থাপনায় হামলার হুমকি দিচ্ছেন। তাঁর বক্তব্য শুনে মনে হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রকে তিনি আরেকটি ‘অনন্তকালের যুদ্ধে’ (Endless War) জড়িয়ে ফেলছেন।”
ট্রাম্পের পূর্বের হুমকি অনুযায়ী ইরানের বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলা চালালে তা আন্তর্জাতিক নীতি অনুযায়ী ‘যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে গণ্য হতে পারে বলে হুঁশিয়ারি দেন সমালোচকরা।
অন্য দিকে, সিনেটর কার্স্টেন গিলিব্র্যান্ড সরাসরি প্রতিরক্ষামন্ত্রীকে তুলাধোনা করে বলেন,
“মানুষ আপনাদের প্রশাসনের ওপর চরম ক্ষুব্ধ। কারণ আপনাদের কথা ও কাজের কোনো মিল নেই। আপনারা কখনো বলেন যুদ্ধ শেষ, আবার বলেন শেষ হয়নি। কখনো বলেন দুই সপ্তাহ লাগবে, পরক্ষণেই অবস্থান বদলান। এই অসংলগ্ন বার্তার কারণেই জনগণের আস্থা তলানিতে ঠেকেছে।”
প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অত্যন্ত সামান্য হওয়ায় এই ধরনের বাজেট বিল পাস করতে ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন নেওয়া ছাড়া ট্রাম্প প্রশাসনের উপায় নেই।
আইনপ্রণেতাদের তীব্র সমালোচনার মুখেও পিট হেগসেথ অতিরিক্ত তহবিলের প্রস্তাবটি দ্রুত অনুমোদনের অনুরোধ জানান। একই সাথে ২০২৭ অর্থবছরের জন্য পেন্টাগনের প্রস্তাবিত ১.৫ ট্রিলিয়ন (দেড় লাখ কোটি) ডলারের মূল সামরিক বাজেট পাসেরও জোর দাবি তোলেন তিনি।
আইনপ্রণেতাদের উদ্দেশ্যে হেগসেথ বলেন,
“আমি দৃঢ়ভাবে মনে করি, পেন্টাগনকে এই দেড় ট্রিলিয়ন ডলারের তহবিল না দেওয়াই বর্তমানে আমাদের জাতির সুরক্ষার জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি।”
চলতি মাসের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি ভেস্তে যাওয়ার পর থেকে উভয় পক্ষই আবারও একে অপরের ওপর প্রতিনিয়ত পাল্টাপাল্টি হামলা চালিয়ে যাচ্ছে, যা মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্ব রাজনীতিকে এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।

