কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির বৈশ্বিক নিয়ন্ত্রণ ও নীতিনির্ধারণে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় এক বিশাল ভূ-রাজনৈতিক মাস্টারস্ট্রোক দিল বেইজিং। সাংহাইতে অনুষ্ঠিত চার দিনব্যাপী ‘বিশ্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্মেলন’ (ডব্লিউএআইসি)-এর উদ্বোধনী আসরে চীনের নেতৃত্বে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করেছে ২৯ দেশের শক্তিশালী আন্তর্জাতিক জোট—‘বিশ্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সহযোগিতা সংস্থা’ (ডব্লিউএআইসিও)।
বিশ্লেষকদের মতে, দ্রুত বিকাশমান এই প্রযুক্তির উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণে ওয়াশিংটনের একক প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বেইজিং নিজেকে নতুন বৈশ্বিক এআই ব্যবস্থার অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতেই এই পদক্ষেপ নিয়েছে।
এটি কোনো একক দেশের একক প্রদর্শনী নয়, আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সিম্ফনি” — সি চিন পিং
২০১৮ সালে যাত্রা শুরুর পর এবার নবমবারের মতো অনুষ্ঠিত হচ্ছে এই সম্মেলন। এবারের প্রতিপাদ্য—‘এআই পার্টনারশিপ ফর আ ব্রাইটার ফিউচার’ (উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়তে এআই অংশীদারত্ব)।
সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভিডিও বার্তায় চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং প্রযুক্তির ওপর কোনো একটি দেশের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে তীব্র হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, তাঁর এই তীর্যক মন্তব্য ছিল সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্যে।
সি চিন পিং বলেন, “এআইয়ের উন্নয়ন কোনো একক দেশের একক প্রদর্শনী হওয়া উচিত নয়। এটি আন্তর্জাতিক সহযোগিতার একটি সিম্ফনি (ঐকতান) হওয়া উচিত।”
তিনি আরও যোগ করেন, “এআই খাতে জাতীয় নিরাপত্তার ধারণাকে অতিরঞ্জিত করা বা একটি দেশের নিরাপত্তাকে অন্য দেশের নিরাপত্তার ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়ার চেষ্টার যৌথ বিরোধিতা করতে হবে।” এছাড়া, এআই যেন সব সময় মানুষের নিয়ন্ত্রণে থাকে, সে জন্য উপযুক্ত বিধিবিধান ও আগাম সতর্কতামূলক ‘মানুষকেন্দ্রিক’ দৃষ্টিভঙ্গির ওপর জোর দেন তিনি।
কী এই ‘ডব্লিউএআইসিও’ এবং কারা আছে এই জোটে?
‘বিশ্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সহযোগিতা সংস্থা’ (ডব্লিউএআইসিও) নামের এই আন্তgovernmental বা আন্তঃসরকারি সংস্থাটি আনুষ্ঠানিকভাবে গত বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) গঠিত হয়। সাংহাইভিত্তিক এই সংস্থার চুক্তি স্বাক্ষরের সময় জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
সংস্থাটির মূল লক্ষ্য হলো আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করা এবং সদস্য দেশগুলোর জন্য একটি নিরাপদ ও উপকারী এআই নীতিমালা গড়ে তোলা। এই জোটের ২৯টি প্রতিষ্ঠাতা সদস্য দেশের তালিকায় রয়েছে ‘গ্লোবাল সাউথ’ বা বৈশ্বিক দক্ষিণের বেশ কিছু প্রভাবশালী রাষ্ট্র। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য:
🇮🇩 ইন্দোনেশিয়া
🇧🇷 ব্রাজিল
🇲🇾 মালয়েশিয়া
🇿🇦 দক্ষিণ আফ্রিকা
🇸🇳 সেনেগাল
🇷🇺 রাশিয়া
🇵🇰 পাকিস্তান
তীব্র হচ্ছে ‘চিপ যুদ্ধ’: শক্তি ও সক্ষমতায় কে কোথায়?
এআই প্রযুক্তির মূল চালিকাশক্তি হলো উন্নত চিপ ও সেমিকন্ডাক্টর। এই খাতকে কেন্দ্র করে দুই পরাশক্তির মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য যুদ্ধ এখন চরম তুঙ্গে।
যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা: জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে গত মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বিভাগ চীনের মূল কোম্পানি বা তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠানের কাছে গুরুত্বপূর্ণ সেমিকন্ডাক্টর ও প্রযুক্তি রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা পুনর্ব্যক্ত করে।
চীনের পাল্টা আঘাত: জবাবে বেইজিং মার্কিন কোম্পানিগুলোর কাছে দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য (ডুয়েল ইউজ) প্রযুক্তি এবং চিপ তৈরির জন্য অপরিহার্য বিরল খনিজ (Rare Minerals) রপ্তানি নিষিদ্ধ করে।
চীনের বাড়তি সুবিধা: সবচেয়ে আধুনিক সেমিকন্ডাক্টর পাওয়ার ক্ষেত্রে চীন এখনো যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে কিছুটা পিছিয়ে থাকলেও, দুটি ক্ষেত্রে বেইজিং অনন্য সুবিধা পাচ্ছে:
১. বিশাল ডেটা সেন্টার ও খনিজ সম্পদ: এআই মডেল প্রশিক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় বিশাল ডেটা সেন্টার চালানোর সক্ষমতা এবং চিপ তৈরির বিরল খনিজের বৈশ্বিক বাজারের সিংহভাগই চীনের নিয়ন্ত্রণে।
২. সস্তা ও বিপুল বিদ্যুৎ উৎপাদন: এআই প্রযুক্তির জন্য যে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়, রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোগত বিনিয়োগের কল্যাণে চীন বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে।
সম্মেলনের প্রথম দিনেই চীন এমন সব অত্যাধুনিক এআই মডেল ও প্রযুক্তি প্রদর্শন করেছে, যা সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের সিলিকন ভ্যালির প্রযুক্তিগত সক্ষমতার সঙ্গে টক্কর দিতে পারে। বিশ্বজুড়ে চীনের তৈরি এসব এআই মডেলের গ্রহণযোগ্যতা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাওয়ায়, আগামী দিনগুলোতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বৈশ্বিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যকার লড়াই যে আরও নাটকীয় মোড় নেবে, তা বলাই বাহুল্য।

