বৈশ্বিক বাজারের অনিশ্চয়তা, গ্যাস-জ্বালানি সংকট এবং দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে পণ্য রপ্তানিতে ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। নতুন অর্থবছরে সর্বমোট ৫৫.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য এবং ৮.২ বিলিয়ন ডলারের সেবা রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।
গতকাল রবিবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে নতুন অর্থবছরের এই লক্ষ্যমাত্রার তথ্য তুলে ধরেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।
তিনি জানান, বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রকৃত আয়ের তুলনায় এই লক্ষ্যমাত্রা ১৫ শতাংশ বেশি। গত অর্থবছরে বাংলাদেশ ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছিল, যা আগের অর্থবছরের চেয়ে ০.৫৮ শতাংশ কম।
পোশাক খাত ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক বাস্তবতা
বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি অবদান রাখা তৈরি পোশাক খাতে গত অর্থবছরে ১.৬৪ শতাংশ নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে—মোট আয় দাঁড়িয়েছে ৩৮.৭০ বিলিয়ন ডলারে।
শিল্প খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন:
জ্বালানির ক্রমবর্ধমান উচ্চ ব্যয় এবং গ্যাস সংকট
প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোতে মূল্যস্ফীতি ও ভোক্তা চাহিদা কমে যাওয়া
আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর কাছে অতিরিক্ত পণ্যের মজুত
২০২১-২২ অর্থবছরে রেকর্ড ৫২ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানির পর টানা দুই অর্থবছর দেশীয় রপ্তানি আয় কমেছে। ফলে বর্তমান সংকটে দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানো কিছুটা কঠিন হতে পারে।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতাদের মতামত
সরকারের দেওয়া প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রাকে অনেকটাই “উচ্চাকাঙ্ক্ষী” মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা:
আবদুর রাজ্জাক (চেয়ারম্যান, র্যাপিড):
“১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন একেবারেই অসম্ভব নয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের প্রভাব পড়তে পারে। তবে গত অর্থবছরের ভিত্তি দুর্বল থাকায় এবার কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ রয়েছে।”
মোহাম্মদ হাতেম (সভাপতি, বিকেএমইএ):
“গ্যাস সংকটে কারখানার উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বর্তমান বাস্তবতায় সরকারের নির্ধারিত লক্ষ্য বাস্তবসম্মত নয়; বছরের শেষে ২ থেকে ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি পেলেই আমরা সন্তুষ্ট থাকব।”
এম মাসরুর রিয়াজ (চেয়ারম্যান, পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ):
“অভ্যন্তরীণ উৎপাদন সংকট এবং বৈশ্বিক চাপ—দুই কারণেই নির্ধারিত ১৫ শতাংশ লক্ষ্য অর্জন করা অত্যন্ত কঠিন হবে।”
এফটিএ চুক্তি ও এলডিসি উত্তরণ পেছানোর পরিকল্পনা
বাণিজ্যমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলনে জানান, নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ায় নীতিগত স্থিতিশীলতা ও পূর্বানুমানযোগ্যতা বাড়বে, যা রপ্তানি বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখবে।
নতুন দ্বিপাক্ষিক চুক্তি: দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) আগামী কয়েক মাসের মধ্যে সই হতে পারে। এছাড়া জাপানের সঙ্গে সই হওয়া একই ধরনের চুক্তি সংসদের পরবর্তী অধিবেশনে অনুমোদনের প্রক্রিয়াধীন।
মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA): চলতি বছরের মধ্যে অন্তত ৬টি দেশের সঙ্গে এফটিএ সইয়ের পরিকল্পনা রয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (EU) সাথেও বিশেষ বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে।
এলডিসি (LDC) উত্তরণ: জাতিসংঘ উন্নয়ন নীতি সংক্রান্ত কমিটি (UNCDP) এবং ইকোসক (ECOSOC) বাংলাদেশের আবেদনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। ফলে বাংলাদেশের উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদায় উত্তরণের সময়সীমা আরও তিন বছর পিছিয়ে ২০২৯ সাল পর্যন্ত যেতে পারে।

