পণ্য কারখানাতেই রয়ে গেছে, অথচ শুল্ক কর্তৃপক্ষের সার্ভারে সেটি বন্দরে পৌঁছে জাহাজে উঠে গেছে বলে ছাড়পত্র তৈরি হয়েছে! কোনো প্রকার পণ্য চট্টগ্রাম বন্দর বা সংশ্লিষ্ট ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোতে (আইসিডি) না পাঠিয়েও কাগজপত্রে ২৪ কোটি টাকার ভুয়া বা ‘ভূতুড়ে’ রপ্তানি দেখানোর এক বড় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য জালিয়াতি উন্মোচিত হয়েছে।
সম্প্রতি দ্য ডেইলি স্টারের এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, চলতি বছরের মে মাসে ঈদুল আজহার ছুটির সুযোগ নিয়ে দেশের অন্তত ৭টি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান এমন ১২২টি সন্দেহভাজন চালানের মাধ্যমে প্রতারণার জাল বুনেছে। ইতোমধ্যে কাস্টমস ও আইসিডি কর্তৃপক্ষের অনুসন্ধানে এর মধ্যে অন্তত ২৯টি চালানকে শতভাগ ভুয়া বা ভূতুড়ে রপ্তানি হিসেবে নিশ্চিত করা হয়েছে।
কাস্টমস কর্মকর্তা ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের মতে, বন্ডেড ওয়্যারহাউস ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে কতিপয় অসাধু ব্যবসায়ী শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানি করে তা বিদেশে রপ্তানি না করে স্থানীয় খোলা বাজারে চড়া দামে বিক্রি করে দিয়েছেন (যা শুল্কসহ বিক্রি করলে ৮৯% থেকে ১৫৯% পর্যন্ত কর দেওয়ার বিধান রয়েছে)। পরবর্তীতে এনবিআরের অনলাইন শুল্ক ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা ‘অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড’ (ASYCUDA World)-এ কাস্টমস কর্মকর্তাদের সিল ও স্বাক্ষর জাল করে ভুয়া রপ্তানির ছাড়পত্র তৈরি করা হয়।
এই কৌশলে ব্যবসায়ীরা দুটি বড় সুবিধা হাতিয়ে নেন:
১. বন্ডের কাঁচামাল স্থানীয় বাজারে বিক্রি করলেও কাগজপত্রে রপ্তানি দেখিয়ে কাস্টমসের দায় এড়ানো।
২. ভুয়া রপ্তানি দেখিয়ে সরকারের দেওয়া ২ শতাংশ নগদ প্রণোদনা (Cash Incentive) দাবি করা।
৩. আমদানির সময় দাম বেশি দেখিয়ে বিদেশে অর্থ পাচার (Money Laundering) এবং তা বৈধ করতে ভুয়া নথির ব্যবহার।
ওজন অসঙ্গতিতে উন্মোচন এবং ইপিবি-ব্যাংক তথ্যের অসামঞ্জস্য
গত ২৪ মে নারায়ণগঞ্জের ‘আরটি ফ্যাশন’ নামক প্রতিষ্ঠান সামিট অ্যালায়েন্স পোর্টে ২৩,৯৯২ কেজি পোশাক রপ্তানির ঘোষণা দেয়। সেখানে মোট ওজন ও নিটের ওজন হুবহু একই দেখানো হলে কাস্টমস কর্মকর্তাদের সন্দেহ হয়। তদন্তে দেখা যায়, কাস্টমস কর্মকর্তা তানজিনা জান্নাত আইভিসহ চার কর্মকর্তার সিল-স্বাক্ষর জাল করে চালানটি ছাড় করা হয়েছে।
তত্ত্বাবধায়ক সংস্থা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-র তথ্য মতে, সরকারি সংস্থাগুলোর রপ্তানি তথ্যের বড় ফারাক এই দুর্নীতিরই ইঙ্গিত দেয়। ইপিবি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে গত অর্থবছরে প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলারের অস্বাভাবিক ব্যবধান পরিলক্ষিত হয়েছে।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের আইসিডি কমিশনার আবুল বাশার মো. শফিকুর রহমান জানিয়েছেন, জড়িতদের শনাক্ত করতে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু কয়েকজনকে অভিযুক্ত না করে ‘অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড’ ব্যবস্থার একটি স্বাধীন ফরেনসিক অডিট সম্পন্ন করা না হলে এই বিশাল আন্তর্জাতিক প্রতারণাচক্রকে গোড়া থেকে উপড়ে ফেলা সম্ভব নয়।

