মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের সুদূরপ্রসারী ও নেতিবাচক ধাক্কা এসে পৌঁছেছে বাংলাদেশের গৃহস্থালি থেকে শুরু করে জাতীয় অর্থনীতিতে। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, গ্যাসে তীব্র সংকট, সার উৎপাদনে ধস এবং ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি দেশের পরিবহন, কৃষি, স্বাস্থ্য ও উৎপাদন খাতকে মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলেছে।
বিশ্বব্যাংকের জুনের মাঝামাঝি সময়ে প্রকাশিত এক মূল্যায়নে সতর্ক করা হয়েছে যে, এই সংকট দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশে আনুমানিক ৬ লাখ মানুষ চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে পড়বেন। একই সাথে চলতি বছর যে বিপুল পরিমাণ মানুষের দারিদ্র্যসীমা থেকে বেরিয়ে আসার কথা ছিল, সেই ধারাও ব্যাপকভাবে ব্যাহত হবে।
বাংলাদেশ তার প্রাথমিক জ্বালানির অর্ধেকের বেশি গ্যাসের ওপর নির্ভর করে। তবে অবকাঠামোগত ও বৈশ্বিক সংকটে এই খাত চরম সংকটে পড়েছে:
আমদানি নির্ভরতা: বাংলাদেশ তার প্রয়োজনীয় অপরিশোধিত তেলের ৬০-৬৫% এবং এলএনজির (LNG) ৫৫-৬০% মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করে।
সরবরাহ সংকট (Force Majeure): বিশ্ববাজারে অস্থিরতার কারণে পেট্রোবাংলার ৬টি এলএনজি চুক্তির মধ্যে ৫টিতেই ‘ফোর্স মেজর’ ঘোষণা করা হয়েছে।
স্পট মার্কেটে চড়া দাম: প্রতি মিলিয়ন বিটিইউ (MMBTU) এলএনজির দাম স্পট মার্কেটে ২৪ থেকে ২৮ ডলারে উঠে গেছে, যা স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি।
উৎপাদন হ্রাস: ২০১৬ সালের সর্বোচ্চ উৎপাদনের তুলনায় দেশীয় গ্যাস ক্ষেত্রগুলো থেকে উৎপাদন প্রায় ১৫% কমে গেছে।
বাংলাদেশের প্রায় ৪০% মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক বাজারে সার ও জ্বালানির সংকট খাদ্য উৎপাদনে বড় হুমকি তৈরি করছে:
সার কারখানায় উৎপাদন বন্ধ: দেশের ৬টি ইউরিয়া সার কারখানার মধ্যে ৫টিই গ্যাসের অভাবে উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে।
সারের দাম বৃদ্ধি: আন্তর্জাতিক বাজারে ইউরিয়ার দাম ইতোমধ্যে ৩০% বেড়েছে। সংকট দীর্ঘায়িত হলে সারের দাম দ্বিগুণ হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছে বিশ্বব্যাংক।
কৃষি উপকরণের সংকট: দেশে প্রতি হেক্টরে গড়ে ৩৯ই.৯ কেজি সার ব্যবহৃত হয় (বৈশ্বিক গড়ের দ্বিগুণেরও বেশি)। সার ও জ্বালানি আমদানিতে বিঘ্ন ঘটলে ক্ষুদ্র কৃষকরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের কারণে সেবা সরবরাহ বজায় রাখতে হিমশিম খাচ্ছে দেশের স্বাস্থ্য খাত:
হাসপাতালের খরচ বৃদ্ধি: দেশের ৬৪টি বড় সরকারি হাসপাতালের প্রতিটিতে কেবল বিদ্যুৎ বিল বাবদ মাসে ৬ থেকে ১১ লাখ ডলার খরচ হয়। বিদ্যুৎ ঘাটতিতে জেনারেটর চালাতে গিয়ে বেসরকারি হাসপাতালে জ্বালানি ব্যয় বহুগুণ বেড়েছে।
আমদানি নির্ভরতা: হাসপাতালের ৯০% সরঞ্জাম ও ২৫০টি ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। জাহাজভাড়া ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় ওষুধ উৎপাদন ও চিকিৎসা খরচ বেড়ে যাচ্ছে।
সংক্রামক ব্যাধির প্রাদুর্ভাব: মার্চ থেকে শুরু হওয়া হামের প্রাদুর্ভাব ও শিশু মৃত্যুর ঘটনা সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে সরকার, যা অর্থ সংকটের কারণে আরও জটিল হচ্ছে।
নীতি-নির্ধারকদের প্রতিক্রিয়া ও বিশেষজ্ঞ মতামত
সরকারের বক্তব্য: অর্থমন্ত্রী ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। তিনি উল্লেখ করেন, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ না থাকলে মূল্যস্ফীতি আরও কমত। অতীতের অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা ও কাঠামোগত দুর্বলতা রাতারাতি সমাধান সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি জানান, পরিস্থিতি সামলাতে সরকার প্রক্রিয়াধীন এলএনজি প্রক্রিয়াজাতকরণ সক্ষমতা বাড়ানোর পথ খুঁজছে।
বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন: সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (CPD) বিশিষ্ট ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, কারখানায় গ্যাসের নতুন সংযোগ বন্ধ থাকা, কাজের সময় কমানো এবং কারখানা বন্ধ হয়ে শ্রমিকদের চাকরি হারানোর যে বাস্তবতা বর্তমানে দেখা যাচ্ছে—বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে মূলত সেই চিত্রটিই আনুষ্ঠানিকভাবে ফুটে উঠেছে।

