বাংলাদেশ যখনই কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা মানবিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছে, চীন সবসময়ই বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে পাশে দাঁড়িয়েছে বলে জানিয়েছেন ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন। দুর্যোগপূর্ণ সময়ে ঢাকার প্রতি বেইজিংয়ের এই সার্বিক ও ধারাবাহিক সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে বলে পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
বুধবার (২২ জুলাই) রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির (বিডিআরসিএস) জাতীয় সদর দপ্তরে এক অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন চীনা রাষ্ট্রদূত। এ সময় দেশজুড়ে সাম্প্রতিক বন্যা ও ভূমিধসে ক্ষতিগ্রস্তদের জরুরি সহায়তার অংশ হিসেবে চীনের রেডক্রস সোসাইটির পক্ষ থেকে বিডিআরসিএস-এর হাতে ১ লাখ মার্কিন ডলারের অনুদান তুলে দেওয়া হয়। সংস্থার চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার মো. আবদুস সালাম চীনের পক্ষ থেকে এই আর্থিক সহায়তা গ্রহণ করেন।
ভারী বর্ষণ ও সাম্প্রতিক আকস্মিক বন্যার তীব্রতার কথা উল্লেখ করে ইয়াও ওয়েন বলেন, ভয়াবহ এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে অনেক প্রাণহানির পাশাপাশি লাখ লাখ মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। একই সঙ্গে কৃষি ও অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এই কঠিন সময়ে চীনের জনগণ ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশীদের প্রতি গভীর সহানুভূতি প্রকাশ করছে এবং প্রদানকৃত এই অনুদান মূলত বাংলাদেশের প্রতি চীন সরকার ও জনগণের আন্তরিক সংহতিরই প্রতিফলন।
রাষ্ট্রদূত আরও স্পষ্ট করেন যে, চীন কেবল তাৎক্ষণিক জরুরি সহায়তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং বার্ষিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি এবং উন্নত বন্যা মোকাবিলা সরঞ্জাম সরবরাহের মাধ্যমে বাংলাদেশের সার্বিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা বৃদ্ধিতেও কাজ করে যাচ্ছে। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, গত বছর চীনে তৈরি যেসব বিশেষায়িত সরঞ্জাম বিডিআরসিএস-কে দেওয়া হয়েছিল, তা বর্তমানে চলমান উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে অত্যন্ত কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। একই সঙ্গে বিডিআরসিএস স্বেচ্ছাসেবকদের আন্তর্জাতিকমানের প্রশিক্ষণ প্রদানের প্রতিশ্রুতিও পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
সহায়তা গ্রহণ করে বিডিআরসিএস চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার মো. আবদুস সালাম চীন সরকার, দেশটির জনগণ এবং রেডক্রস সোসাইটি অব চায়নার প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি জানান, চীন সরকারের প্রদত্ত এই অর্থিক অনুদানের ফলে বিডিআরসিএস দুর্গম ও পানিবন্দী এলাকাগুলোতে খাদ্যসহায়তা, নিরাপদ পানীয় জল, অস্থায়ী আশ্রয়, স্বাস্থ্যবিধি কিট বিতরণ এবং জরুরি চিকিৎসাসেবা প্রদানের পরিধি আরও সম্প্রসারণ করতে পারবে।
বাংলাদেশ-চীন সুদীর্ঘ বন্ধুত্বের ঐতিহাসিক পটভূমি তুলে ধরে আবদুস সালাম উল্লেখ করেন, দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মূল ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং পরবর্তীতে এই সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যান সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক চীন সফরের ধারাবাহিকতায় মানবিক, অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক খাতে এই দ্বিপক্ষীয় অংশীদারত্ব ভবিষ্যতে আরও সুদৃঢ় হবে।
অনুষ্ঠানে বিডিআরসিএস-এর চলমান জরুরি উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমের একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। ২১ জুলাই পর্যন্ত সংগৃহীত তথ্যানুযায়ী, বন্যা মোকাবিলায় সংস্থাটি ইতিমধ্যে ৩.৩৯ মিলিয়ন (৩৩ লাখ ৯০ হাজার) টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। এ ছাড়া এখন পর্যন্ত ২ হাজার ৫০০-এর বেশি পরিবারকে খাদ্য প্যাকেজ প্রদান, ২২ হাজারের বেশি মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে স্থানান্তর, ২ হাজার মানুষকে চিকিৎসা সেবা এবং ৩৭ হাজার লিটারের বেশি বিশুদ্ধ খাবার পানি বিতরণ করা হয়েছে। মাঠপর্যায়ে উদ্ধারকাজ পরিচালনা ও তদারকির জন্য বিডিআরসিএস-এর ১২টি ইউনিট পূর্ণ সক্রিয় রয়েছে এবং ৩ হাজার ৫০০-এর বেশি নিবেদিতপ্রাণ স্বেচ্ছাসেবক দিনরাত কাজ করে যাচ্ছেন।
অনুষ্ঠানে বিডিআরসিএস-এর ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. রফিকুল কবির, কোষাধ্যক্ষ ড. আবু মো. মোফাখখারুল ইসলাম রানা, মহাসচিব ড. কবির মো. আশরাফ আলম (এনডিসি)-সহ আন্তর্জাতিক রেডক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি ফেডারেশন (আইএফআরসি) এবং চীনা দূতাবাসের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

