বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে উদ্বেগজনক হারে ছড়িয়ে পড়ছে নোনা পানি। সরকারি এক সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, উপকূলীয় ১৯টি জেলার মধ্যে ১৮টিরই প্রায় ৬৮ শতাংশ কৃষিজমি এখন লবণাক্ততায় আক্রান্ত। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, মাটি ও ভূগর্ভস্থ পানি দুটিতেই লবণাক্ততা ছড়িয়ে পড়ায় দেশের খাদ্য নিরাপত্তা এবং লাখ লাখ মানুষের জীবিকা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।
মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট (এসআরডিআই) প্রণীত ‘বাংলাদেশ মৃত্তিকা লবণাক্ততা মানচিত্র ২০২৪’-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সাল পর্যন্ত দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ১৭ লাখ ৩ হাজার হেক্টর কৃষিজমির মধ্যে অন্তত ১১ লাখ ৫৬ হাজার হেক্টর জমি লবণাক্ততায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২০০৯ সালে এই পরিমাপ ছিল ১০ লাখ ৫৬ হাজার হেক্টর।
অর্থাৎ, মাত্র ১৫ বছরের ব্যবধানে নতুন করে ১ লাখ হেক্টর (১,০০০ বর্গকিলোমিটার) কৃষিজমি লবণাক্ত হয়ে পড়েছে—যা আয়তনে প্রায় পুরো মুন্সিগঞ্জ জেলার সমান। উল্লেখ্য, স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে করা প্রথম জরিপে লবণাক্ত জমির পরিমাণ ছিল ৮ লাখ ৩৩ হাজার হেক্টর।
উপকূল ছাড়িয়ে লোকালয়ে নোনা পানি
এসআরডিআই-এর প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও বিভাগীয় প্রধান আমীর মো. জাহিদ বলেন:
“উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততার পরিধি ও তীব্রতা দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়াটা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।”
উপকূলীয় অঞ্চলগুলো দেশের মোট ভূখণ্ডের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এবং সেখানে প্রায় ৪ কোটি ৩৮ লাখ মানুষ বসবাস করে। নোনা পানির প্রভাবে এখানকার কৃষকরা ফলন হ্রাস, খাবার পানির সংকট এবং জীবনযাত্রার মান অবনতির মতো সংকটে জর্জরিত।
সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, লবণাক্ততা এখন শুধু উপকূলীয় এলাকাতেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা ক্রমশ দেশের ভেতরের দিকে ছড়িয়ে পড়ছে:
নতুন আক্রান্ত এলাকা: গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী ও মুকসুদপুর এবং যশোর সদর উপজেলা এবার প্রথমবারের মতো লবণাক্ততার মানচিত্রে যুক্ত হয়েছে।
ঝুঁকিতে থাকা এলাকা: আগামীতে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পেলে ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা এবং মাগুরার মোহাম্মদপুর উপজেলাও নোনা পানির আগ্রাসনে পড়তে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
জরুরি পদক্ষেপের আহ্বান
দুই বছর ধরে চালানো এই গবেষণায় বলা হয়, নগরায়নের কারণে এমনিতেই দেশের কৃষিজমি দিন দিন কমছে, তার ওপর নোনা পানির এই অনুপ্রবেশ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
গবেষণা দলের প্রধান আমীর মো. জাহিদ হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “এখনই জরুরি ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে আরও নতুন নতুন এলাকা লবণাক্ত হয়ে পড়বে, যা আমাদের সামগ্রিক কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনবে।”

