এখানে প্রদান করা বক্তব্যটির ব্যাকরণ, সাবলীলতা ও স্পষ্টতা আরও উন্নত করে একটি পরিমার্জিত (Modify) রূপ নিচে দেওয়া হলো:
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো যেকোনো সরকারের জনপ্রিয়তায় ধস নামানোর জন্য যথেষ্ট। কারণ, তেলের দাম বাড়লেই পরিবহন ভাড়া বাড়ে, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ে, মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যায়, এমনকি পাড়ার চায়ের দোকানেও ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। স্বাভাবিকভাবেই বিরোধী দলও এতে সমালোচনার বড় সুযোগ পায়। তা সত্ত্বেও, এ বছর এশিয়ার প্রায় প্রতিটি তেল আমদানিকারক দেশই বাধ্য হয়ে এই কঠিন সিদ্ধান্তটি নিয়েছে। মূলত দীর্ঘদিন ধরে জমতে থাকা বিশাল আর্থিক লোকসান কমানোর জন্য এটিই ছিল একমাত্র উপায়।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের একটি সিংহভাগ তেল প্রবাহিত হয় এবং এর বড় অংশই আসে এশিয়ায়। তাই এই নৌপথ কোনো কারণে বাধাগ্রস্ত হলে বা বন্ধ হয়ে গেলে তার প্রথম ধাক্কা এসে পড়ে আমাদের মতো দেশগুলোতে। সম্প্রতি এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেলের দাম একলাফে অনেকটাই বেড়ে গেছে, যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে আমাদের দেশেও। এই অবস্থায় প্রতিটি সরকারকেই এক কঠিন দ্বিধার মুখোমুখি হতে হয়েছে—হয় এখনই জনগণকে বাড়তি দামের বোঝার মুখোমুখি করা, অথবা এমন কোনো কৌশল নেওয়া যাতে ক্ষতিটা সরাসরি চোখে না পড়ে।
বাংলাদেশ এই দুটি কৌশলেরই মিশ্র প্রয়োগ করেছে। গত এপ্রিলে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১৫ টাকা বাড়িয়ে ১১৫ টাকা করা হয়েছিল। পাঁচ মাস সেই দামে স্থির থাকার পর, গত ২১ সেপ্টেম্বর তা আরও বাড়িয়ে ১৩৫ টাকায় নির্ধারণ করা হয়। উল্লেখ্য, এই ডিজেলই দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি, যা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) মোট জ্বালানি বিক্রির প্রায় ৬৫ শতাংশ।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। তার ওপর আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার কারণে জাহাজ ভাড়াও আকাশচুম্বী হয়েছে। ফলে মার্চ থেকে আগস্ট—এই ছয় মাসে বিপিসির লোকসানের পরিমাণ দাঁড়ায় ২২ হাজার ৮৭৬ কোটি টাকা।
কর্মকর্তাদের আশা, এই নতুন নির্ধারিত দামের কারণে বার্ষিক লোকসান প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা কমানো সম্ভব হবে। পাশাপাশি, এতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সাশ্রয় হবে এবং পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে তেল পাচার ঠেকানো সহজ হবে, কারণ সেসব দেশে তেলের দাম এখনও অনেক বেশি।
তবে সমস্যার আসল জায়গাটি অন্যখানে। তেলের দাম না বাড়িয়ে কৃত্রিমভাবে কমিয়ে রাখলে সরকারের লোকসান অদৃশ্য হয়ে যায় না; বরং তা সরকারের ঋণের বোঝা বাড়িয়ে দেয় এবং জ্বালানি সরবরাহকারীদের পাওনা পরিশোধে বিলম্ব ঘটায়। পাম্পে তেলের দাম কম রাখা বা ধরে রাখা আপাতদৃষ্টিতে জনবান্ধব মনে হলেও, এটি মূলত সরকারের বড় আর্থিক চাপকে জনগণের নজর থেকে আড়াল করার একটি কৌশল মাত্র।
বাংলাদেশ তার মোট চাহিদার ৯৫ শতাংশ তেল এবং ৩০ শতাংশ গ্যাস বাইরে থেকে আমদানি করে। ফলে বিশ্ববাজারের মূল্যের ওপরই আমাদের দেশীয় বাজার সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। অর্থাৎ, বিশ্ববাজারে দাম বাড়লে সেই বাড়তি মাশুল আমাদেরও গুনতে হয়।
তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—‘আমরা কেন এমন অনিয়মিত মূল্য সমন্বয়ের পদ্ধতি অনুসরণ করছি? আর যারা এই হঠাৎ দাম বৃদ্ধির তীব্র ধাক্কা সামলাতে পারছে না, তাদের সুরক্ষারই বা কী হবে?’
এক্ষেত্রে আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোর কৌশল পর্যালোচনা করা যেতে পারে, কারণ তারাও একই জ্বালানি সংকট মোকাবিলা করছে:
পাকিস্তান: তারা এখন প্রতিদিন আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জ্বালানির দাম নির্ধারণ করে। গত ১ সেপ্টেম্বর যেখানে ডিজেলের দাম ছিল প্রায় ৩৭১ রুপি, ১৮ সেপ্টেম্বরের মধ্যে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৪২৫ রুপিতে। এই ব্যবস্থাটি কিছুটা কঠোর মনে হলেও এটি পুরোপুরি স্বচ্ছ। তবে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ কমাতে পাকিস্তান সরকার মোটরসাইকেল, রিকশা ও ছোট যানবাহনের জন্য লিটারপ্রতি ১০০ রুপি ভর্তুকি বা ছাড়ের ব্যবস্থা করেছে।
শ্রীলঙ্কা: ২০২২ সালের ভয়াবহ জ্বালানি সংকটের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে শ্রীলঙ্কা অত্যন্ত সুশৃঙ্খল একটি পদ্ধতি বেছে নিয়েছে। মার্চ থেকে মে পর্যন্ত তারা ধীরে ধীরে ডিজেলের দাম বাড়ালেও, জুনের শেষে বিশ্ববাজারে দাম কমামাত্রই দেশের বাজারেও তেলের দাম কমিয়ে দেয়। অর্থাৎ, তাদের মূল্য নির্ধারণী নীতিটি উভয় দিকেই (বৃদ্ধি ও হ্রাস) সমানভাবে কার্যকর। পাশাপাশি তারা পরিবহন ও মৎস্য খাতের জন্য নির্দিষ্ট সহায়তা এবং দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য সামাজিক সুরক্ষা জাল বজায় রেখেছে।
ভারত: জ্বালানি সংকট এড়াতে গিয়ে ভারতকে বড় ধরনের রাজস্ব ক্ষতি গুনতে হয়েছে। সরকার মার্চ মাসে আবগারি শুল্ক কমিয়ে পাম্পে দাম অপরিবর্তিত রেখেছিল এবং রাষ্ট্রায়ত্ত শোধনাগারগুলোকে সেই লোকসান বহন করতে বলেছিল। কিন্তু রাজ্য নির্বাচনের পর দাম বাড়াতে বাধ্য হওয়ার আগ পর্যন্ত ভারতের রাজস্বের বিপুল ক্ষতি হয়ে যায়। বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়লেও খুচরা বাজারে দাম না বাড়ানোয় ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানিগুলোকে প্রতিদিন প্রায় ২,৪০০ কোটি রুপি লোকসান গুনতে হয়েছিল।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া:
ফিলিপাইন: তারা তেলের দামে কোনো সরকারি সীমা না রেখে পুরোটাই বাজারের ওপর ছেড়ে দিয়েছে, তবে গণপরিবহন ও চালকদের জন্য সরাসরি আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা রেখেছে।
মালয়েশিয়া: তারা ডিজেলের দাম বাড়ালেও সাধারণ নাগরিকদের জন্য পেট্রোলের ওপর ভর্তুকি বজায় রেখেছে।
ইন্দোনেশিয়া: প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তোর নির্দেশে জাকার্তা এখন একটি দ্বিমুখী নীতি অনুসরণ করছে—বিলাসবহুল জ্বালানির দাম বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু সাধারণ ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষকে সুরক্ষা দিতে রাষ্ট্রীয় বাজেটের ওপর চাপ নিয়ে হলেও তুলনামূলক সস্তা জ্বালানির সরবরাহ অব্যাহত রাখা হয়েছে।
দিনশেষে কোনো না কোনোভাবে প্রতিটি দেশের জনগণকেই এই দামের মাশুল দিতে হচ্ছে। পার্থক্য কেবল একটাই—দাম বৃদ্ধির বিষয়টি কতটা স্বচ্ছভাবে সামলানো হচ্ছে, সময়মতো সমন্বয় করা হচ্ছে কি না, আর মূল ভোগান্তিটা শেষ পর্যন্ত কাদের ওপর গিয়ে পড়ছে।
তাহলে, বাংলাদেশ ঠিক কোন জায়গায় ভুল করল? জ্বালানির দাম বাড়ানোটা হয়তো অর্থনৈতিক দিক থেকে ভুল নয়, কিন্তু ভুল রয়েছে অন্য তিনটি প্রধান জায়গায়:
১. অস্বচ্ছ ও অনিয়মিত মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি: আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে দামের হঠাৎ ধাক্কা বা বড় ব্যবধান এড়াতে ২০২৪ সালে আইএমএফ (IMF)-এর পরামর্শে একটি নির্দিষ্ট মূল্য নির্ধারণী নীতি চালু করা হয়েছিল। কিন্তু এপ্রিল, জুন ও সেপ্টেম্বর মাসে সেই নিয়ম না মেনে সরকার নিজস্ব সুবিধামতো সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই অনিশ্চয়তার কারণে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষ আগাম শংকায় ভোগে এবং ব্যবসায়ীরা সম্ভাব্য বাড়তি খরচের অজুহাতে আগেই পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়।
২. মূল্যবৃদ্ধির অপর্যাপ্ত মাত্রা: ব্র্যাক ইপিএল-এর তথ্যমতে, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে দেশের বাজারে ডিজেলের প্রকৃত মূল্যের পার্থক্য লিটারপ্রতি প্রায় ৮৯ টাকা। অথচ সেটির বিপরীতে মাত্র ২০ টাকা বাড়ানো হয়েছে, যার ফলে ডিজেল এখনো ‘প্রকৃত বাজারমূল্যের’ অনেক নিচেই বিক্রি হচ্ছে। ফলে সরকার দাম বাড়িয়ে রাজনৈতিক সমালোচনার মুখেও পড়ছে, আবার বিপিসির বিশাল আর্থিক ঘাটতিও পূরণ হচ্ছে না—যা একটি উভমুখী সংকট তৈরি করেছে।
৩. সুরক্ষাবেষ্টনীর অভাব: এটিই সম্ভবত সরকারের সবচেয়ে বড় ভুল। পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা বা মালয়েশিয়া তাদের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, পরিবহন খাত বা মৎস্যজীবীদের জন্য কোনো না কোনো ছাড় বা সুরক্ষার ব্যবস্থা রেখেছিল। কিন্তু বাংলাদেশে সাধারণ মানুষের জন্য কোনো ধরনের পূর্বপ্রস্তুতি বা লাইফলাইন ছাড়াই রাতারাতি দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, যার ফলে সাধারণ জনগণ ও নিম্নআয়ের মানুষ চরম দিশেহারা হয়ে পড়েছে।
এই সংকট সামলানোর একটি বড় হাতিয়ার হতে পারত বহু আলোচিত ‘ফার্মার কার্ড’ বা কৃষক কার্ড। পূর্বে এটি নিয়ে কাজ হওয়ায় এর প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ইতিমধ্যেই তৈরি হয়ে আছে। গত এপ্রিলে ২২ হাজার কৃষককে ২,৫০০ টাকা করে সহায়তা দিয়ে এর একটি পরীক্ষামূলক কার্যক্রমও পরিচালিত হয়েছিল। সর্বশেষ দাম বৃদ্ধির মাত্র তিন দিন আগে (১৭ সেপ্টেম্বর) ১ লাখ ১০ হাজার ৩৬৪ জন কৃষককে যুক্ত করে আরও বড় পরিসরে এটি চালুর কথা ছিল। কিন্তু অজানা কারণে সেই উদ্বোধনী অনুষ্ঠান স্থগিত করা হয়েছে এবং নতুন কোনো তারিখ দেওয়া হয়নি।
আসন্ন ডিসেম্বর মাসে বোরো মৌসুমের সেচ কাজ শুরু হওয়ার আগেই সরকারের উচিত দ্রুত কৃষকদের তালিকাভুক্তি সম্পন্ন করা। ডিজেলের বাড়তি দামের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই কার্ডের মাধ্যমে সেচ খরচ বাবদ সরাসরি অর্থ সহায়তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। জ্বালানির দাম বৃদ্ধির যে তীব্র ধাক্কা সাধারণ মানুষ এখন অনুভব করছে, তা কিছুটা হলেও প্রশমিত করতে এই প্রকল্পটিকে অবিলম্বে কার্যকর করা প্রয়োজন।
এর পাশাপাশি মূল্যস্ফীতির যে বড় ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, তাকে হালকাভাবে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ২০২২ সালে যখন ডিজেল ও কেরোসিনের দাম ৪২.৫ শতাংশ বাড়ানো হয়েছিল, তখন দেশে মূল্যস্ফীতি ছিল ৭.৪৮ শতাংশ। বাংলাদেশের ইতিহাসে সেটিই ছিল একদিনে তেলের সবচেয়ে বড় মূল্যবৃদ্ধি। তার মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে ২৬টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মধ্যে ২৫টির দামই ১৪ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গিয়েছিল। পরবর্তী মাসেই মূল্যস্ফীতি এক দশকের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে এবং দীর্ঘকাল সেই উচ্চ হারেই থমকে থাকে।
বর্তমানেও আমাদের পরিস্থিতি খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ইতোমধ্যেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছে যে, জ্বালানি সংকট ও খরচ বৃদ্ধির চাপে চলতি অর্থবছরে দেশের মূল্যস্ফীতি আবারও ৯ শতাংশ স্পর্শ করতে পারে।
তাই এখন আমাদের সামনে এগোনোর পথটি স্পষ্ট হতে হবে:
জ্বালানির দামের যৌক্তিক ও স্বয়ংক্রিয় ফর্মুলায় অবিলম্বে ফিরে যেতে হবে।
মূল্য সমন্বয়ের স্পষ্ট রূপরেখা আগে থেকেই প্রকাশ করতে হবে যেন বাজারে কোনো কৃত্রিম অনিশ্চয়তা তৈরি না হয়।
সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা কৃষক ও নিম্নআয়ের মানুষের সুরক্ষায় ‘কৃষক কার্ড’-এর মাধ্যমে দ্রুত কার্যকরী সহায়তা পৌঁছে দিতে হবে।

