পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের অভিনয় অঙ্গনে এক বটবৃক্ষ হয়ে আছেন রাইসুল ইসলাম আসাদ। একাধারে তিনি বীর মুক্তিযোদ্ধা, ছয়বারের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার বিজয়ী, একুশে পদকপ্রাপ্ত এবং জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের আজীবন সম্মাননায় ভূষিত শিল্পী।
‘পদ্মা নদীর মাঝি’ চলচ্চিত্রে ‘কুবের’ চরিত্রের কালজয়ী রূপায়ণ থেকে শুরু করে ভারতীয় বাংলা চলচ্চিত্রে তাঁর অনন্য অভিনয়—মঞ্চ, টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তিনি দক্ষিণ এশিয়ার বিনোদন জগতে রেখে গেছেন গভীর ছাপ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিয়মিত অভিনয় থেকে কিছুটা দূরে থাকলেও তাঁর কাজের প্রভাব ও অনুরাগীদের ভালোবাসা আজও অমলিন।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত এই প্রবীণ অভিনেতা সাক্ষাৎকার দিয়েছেন ‘দ্য ডেইলি স্টার’-কে। সেখানে তিনি জীবনের অর্থ, আত্মতৃপ্তি, পুরনো বন্ধুত্ব এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পাওয়া ভালোবাসার কথা তুলে ধরেছেন।
“জীবনের চেয়ে সুন্দর আর কিছুই হতে পারে না। কেবল বেঁচে থাকাটাই তো বড় এক আশীর্বাদ। বেঁচে থাকা, দীর্ঘশ্বাস নেওয়া এবং প্রতিটি দিনকে আলিঙ্গন করা—সবকিছুই সুন্দর।”
— রাইসুল ইসলাম আসাদ
দীর্ঘ ক্যারিয়ারে জীবনের নানা চড়াই-উৎরাই দেখেছেন রাইসুল ইসলাম আসাদ। তবে তাঁর মতে, অর্থ দিয়ে সুখ বা সাফল্য পরিমাপ করা যায় না।
“টাকা নিশ্চয়ই গুরুত্বপূর্ণ, তবে মানুষের বেঁচে থাকার জন্য অঢেল টাকার প্রয়োজন নেই। বিপুল অর্থকড়ি ছাড়াও তো জীবন সুন্দরভাবে কেটে যায়, এর অগণিত উদাহরণ চারপাশে ছড়িয়ে আছে। ভালোভাবে আর সুখে বাঁচতে হলে অতিমাত্রায় টাকার প্রয়োজন পড়ে না।”
দেশজুড়ে অজস্র অর্জন ও সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান পাওয়ার পরও জীবনের শেষ বিকেলে দাঁড়িয়ে এই কালজয়ী অভিনেতা মনে করেন, মানুষের ভালোবাসাই তাঁর জীবন সার্থক করেছে।
“আমি জীবনে অনেক কিছুর অভিজ্ঞতা পেয়েছি। মানুষের সম্মান, স্নেহ আর অপরিসীম ভালোবাসা পেয়েছি। আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন এটাই।”
প্রচণ্ড জনপ্রিয়তা থাকা সত্ত্বেও কখনোই কাজের সংখ্যা বাড়ানোর পেছনে ছোটেননি আসাদ।
“আমি চাইলে আরও অনেক বেশি চলচ্চিত্রে অভিনয় করতে পারতাম, কিন্তু সচেতনভাবেই কাজের পরিমাণ বাড়াইনি। তবুও ছয়বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছি। হয়তো ভালো ও অর্থবহ কাজের সাথে যুক্ত থাকার চেষ্টা করেছি বলেই পরম সৃষ্টিকর্তা আমাকে এটি উপহার দিয়েছেন।”
তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম চর্চিত চলচ্চিত্র সৈয়দ সালাউদ্দীন জাকীর ‘ঘুড্ডি’, যেখানে সুবর্ণা মুস্তফার সঙ্গে তাঁর রসায়ন আজও দর্শক হৃদয়ে অমলিন। চলচ্চিত্রটির গান ও দৃশ্যগুলো নিয়ে তিনি বলেন, “এত দশক পরেও মানুষ যখন ‘ঘুড্ডি’ নিয়ে কথা বলে এবং এটি মনে রাখে, সত্যি খুব ভালো লাগে।”
দুই দশকেরও বেশি সময় আগের এক কঠিন পরিস্থিতির স্মৃতিচারণ করেন এই প্রবীণ অভিনেতা। বারডেম হাসপাতালে টানা কয়েক সপ্তাহ চিকিৎসাধীন থাকার পর যখন তাঁকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়েছিল, তখন সারা দেশ কেঁপে উঠেছিল।
“ডাক্তাররাও একপ্রকার আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন। আত্মীয়-স্বজন ও প্রিয়জনেরা হাসপাতালে এসেছিলেন আমাকে শেষবারের মতো দেখতে। কিন্তু মহান আল্লাহর অশেষ রহমত আর কোটি মানুষের প্রার্থনায় আমি বেঁচে ফিরে আসি।”
সেই অলৌকিক জীবন ফিরে পাওয়ার অভিজ্ঞতা আসাদের জীবন দর্শন চিরতরে বদলে দেয়।
“দেশের আনাচে-কানাচে, শহর থেকে গ্রামে—অগণিত মানুষ আমার জন্য দোয়া করেছিলেন। সাধারণ মানুষের প্রার্থনাতেই আমি দ্বিতীয় জীবন পাই। তাই আমি বিশ্বাস করি, মানুষের ভালোবাসা ও প্রার্থনার চেয়ে বড় আর কিছু হতে পারে না।”
মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ও নাটকের স্বর্ণযুগ পার করে আসা এই গুণী শিল্পীর মতে, পুরস্কার বা খ্যাতি কখনোই তাঁর প্রধান লক্ষ্য ছিল না।
“জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে মানুষের যে অফুরন্ত ভালোবাসা পেয়েছি, তা ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব।”
যুক্তরাষ্ট্রে সময় কাটানো সত্ত্বেও দেশের মানুষের ভালোবাসার রেশ একটুও কমেনি বলে জানান তিনি। “বাংলাদেশ থেকে আসা প্রতিটি ফোন, বার্তা এবং মানুষের ভালোবাসা আমাকে গভীর স্পর্শ করে। প্রতিদিন তারা আমাকে মনে করিয়ে দেয়—জীবন সত্যিই কত সুন্দর!”

