জবানবন্দিতে তিনি জানান, কোনো প্রকার সাক্ষ্যপ্রমাণ না রাখার কৌশল হিসেবে র্যাবের অভ্যন্তরীণ পরিভাষায় এই হত্যাকাণ্ডগুলোকে “এলিমিনেশন” (Elimination) বা বিলোপ বলা হতো।
মনিরুল হকের সাক্ষ্যের সবচেয়ে ভয়াবহ অংশটি ছিল ২০১০ সালের মে মাসে বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলায় পরিচালিত একটি অভিযানকে ঘিরে। তিনি জানান, জিয়াউল আহসানের সরাসরি নেতৃত্বে পরিচালিত ওই অভিযানের জন্য র্যাব সদর দপ্তর থেকে তাঁকে কেবল “প্রশাসনিক সহায়তা” দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
পরিবহন ও অপহরণ: মধ্যরাতের পর হাত ও চোখ বাঁধা ৩-৪ জন ব্যক্তিকে মাইক্রোবাস থেকে নামিয়ে চরদুয়ানিয়া ঘাটে নোঙর করা একটি ট্রলারে তোলা হয়।
হত্যাকাণ্ডের নৃশংস পদ্ধতি: ট্রলারটি মোহনার দিকে রওনা দেওয়ার পর বস্তাবন্দী ও চোখ বাঁধা অবস্থায় এক ব্যক্তিকে পয়েন্ট-ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জে গুলি করা হয় এবং সাগরে ফেলে দেওয়ার ঠিক আগে তাঁর পেট ছুরি দিয়ে চিরে ফেলা হয়।
প্রমাণ লোপাটের চেষ্টা: মনিরুল হক ব্যাখ্যা করেন, মরদেহের পেট চিরে দেওয়ার মূল উদ্দেশ্য ছিল—যাতে পেটে গ্যাস জমে লাশ ভেসে না ওঠে এবং সাগরের তলদেশেই তা পচে নষ্ট হয়ে যায়।
তবে এত কৌশল সত্ত্বেও কয়েকদিন পর বাগেরহাটের শরণখোলায় একটি বিকৃত লাশ ভেসে ওঠে, যা পরবর্তীকালে তৎকালীন বিডিআর (BDR) সদস্য নজরুলের বলে শনাক্ত করা হয়।
মনিরুল হক ট্রাইব্যুনালকে জানান, র্যাব সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত মাসিক সমন্বয় সভায় তৎকালীন মহাপরিচালক মোখলেসুর রহমান চিহ্নিত আসামিদের বিষয়ে আলোচনার সময় আরবি শব্দবন্ধ “ওয়াজিবুল কাতল” (মৃত্যুদণ্ড পাওয়ার যোগ্য) ব্যবহার করতেন।
“জামিনে বারবার বেরিয়ে আসা শীর্ষ অপরাধীদের বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে—ব্যাটালিয়ন কমান্ডাররা তা জানতে চাইলে ‘ওয়াজিবুল কাতল’ শব্দটি ব্যবহার করে মূলত তাদের স্থায়ীভাবে নির্মূল করার সংকেত দেওয়া হতো।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন:
সাজানো বন্দুকযুদ্ধ: ভোলা ও সুন্দরবনে তথাকথিত “ডাকাতদের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধ” হিসেবে নথিভুক্ত একাধিক অভিযান ছিল মূলত সাজানো। আসামিদের নির্দিষ্ট স্থানে এনে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হতো।
জোরপূর্বক গুম: তথ্য ফাঁসের সন্দেহে আলকাস নামের এক বেসামরিক মাঝিকে “বিলোপ” (হত্যা) করার নির্দেশ দেন জিয়াউল আহসান। র্যাব-৮-এর একজন কর্মকর্তা তা মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানানোর কিছুদিন পরই আলকাস নিখোঁজ হন এবং ব্যাটালিয়নের খাতায় তাঁর কোনো তথ্য রাখা হয়নি।
নিয়ন্ত্রণহীন কর্তৃত্ব: জিয়াউল আহসানের নেতৃত্বাধীন গোয়েন্দা উইং কোনো প্রথাগত চেইন অব কমান্ড বা নিয়মকানুন না মেনে সরাসরি ব্যাটালিয়ন সদস্যদের মাধ্যমে বেআইনি অভিযান পরিচালনা করত।
জবানবন্দির শেষে মনিরুল হক জিয়াউল আহসানের পরিচালিত এসব কর্মকাণ্ডকে “অনাকাঙ্ক্ষিত, অনিয়ন্ত্রিত এবং সম্পূর্ণ বেআইনি” বলে আখ্যায়িত করেন।
বর্তমানে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন রয়েছেন মেজর জেনারেল (চাকরিচ্যুত) জিয়াউল আহসান। তাঁর বিরুদ্ধে ২০১০ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে অন্তত ১০৪ জন মানুষকে জোরপূর্বক গুম ও হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

