দেশীয় শিল্পকে শক্তিশালী করা এবং বৈদেশিক মুদ্রার অপচয় রোধ করার লক্ষ্যে এক যুগান্তকারী নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সরকারি ভবনের সব ধরনের নির্মাণ প্রকল্পে আমদানিকৃত পণ্যের বদলে দেশীয় টাইলস ও লিফট বা এলিভেটর ব্যবহার বাধ্যতামূলক করেছে প্রকল্প অনুমোদনের সর্বোচ্চ সংস্থা। যেসব ক্ষেত্রে দেশীয় সক্ষমতা রয়েছে, সেসব ক্ষেত্রে বিকল্প হিসেবে বিদেশি পণ্য ব্যবহারে কার্যত নিষেধাজ্ঞা জারি করা হলো।
পরিকল্পনা কমিশনের নথি অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে এই নির্দেশনা চূড়ান্ত করা হয়। অনতিবিলম্বে বাস্তবায়নের জন্য নির্দেশনাটি ইতিমধ্যেই সব মন্ত্রণালয় ও সরকারি বিভাগে আনুষ্ঠানিকভাবে পাঠানো হয়েছে।
শিল্পোদ্যোক্তা ও প্রস্তুতকারকরা সরকারের এই সিদ্ধান্তকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, অভ্যন্তরীণ বাজারের মন্দা কাটিয়ে দেশীয় শিল্পখাতে এটি নতুন প্রাণের সঞ্চার করবে।
পদ্মা সেতু ও ঢাকা মেট্রোরেলের মতো মেগা প্রকল্পগুলোতে দেশীয় পণ্যের অগ্রাধিকার দেওয়ার রেওয়াজ দীর্ঘদিনের হলেও, একনেকের এই নতুন নির্দেশনা বিশেষভাবে লিফট ও সিরামিক টাইলস খাতকে লক্ষ্য করে দেওয়া হয়েছে—যেখানে দেশীয় উৎপাদকরা অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও বাজারে মন্দার মুখোমুখি হচ্ছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পরিকল্পনা কমিশনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, বিপুল মূলধন বিনিয়োগকারী দেশীয় শিল্পগুলোকে টিকিয়ে রাখতে সরকারের কৌশলগত ক্রয়নীতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
“বাংলাদেশ যদি বিশ্বমানের অবকাঠামো তৈরি করতে চায়, তবে দেশীয় প্রস্তুতকারকদের জন্য সুস্পষ্ট মানদণ্ড নির্ধারণ করে দিতে হবে,” ঢাকা বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল নির্মাণের উদাহরণ টেনে ওই কর্মকর্তা বলেন। থার্ড টার্মিনালে স্থানীয় সরবরাহকারীরা জাপানি প্রকৌশলীদের নির্ধারিত মান বজায় রেখে ইস্পাত, সিমেন্ট, ইট ও বালু সফলভাবে সরবরাহ করেছিল। “যদি দেশীয় উৎপাদকরা সেই মানের পণ্য তৈরি করতে পারে, তবে আমদানির কোনো যুক্তি নেই। দেশীয় প্রযুক্তিগত সক্ষমতা না থাকলেই কেবল আমাদের বিদেশি পণ্যের ওপর নির্ভর করা উচিত।”
তিনি আরও বলেন, সম্পূর্ণ তৈরি লিফট আমদানির বদলে দেশেই অ্যাসেম্বলিং (সংযোজন) ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। মানসম্পন্ন যন্ত্রাংশ আমদানি করে স্থানীয়ভাবে লিফট সংযোজন করতে পারলে ক্রয় খরচ প্রায় ৫০ শতাংশ কমানো সম্ভব, যা প্রযুক্তি হস্তান্তরেও সহায়তা করবে।
সিরামিক শিল্পে স্বস্তি ও নতুন আশার আলো
সিরামিক খাত—যা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য উচ্চমানের টাইলস, স্যানিটারিওয়্যার ও তৈজসপত্র তৈরি করে—একনেকের এই নির্দেশনাকে তীব্র আমদানি প্রতিযোগিতার বিরুদ্ধে এক বড় স্বস্তি হিসেবে দেখছে।
এক্স সিরামিক গ্রুপের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মামুনুর রশীদ বলেন, এমন এক সময়ে এই সিদ্ধান্ত এসেছে যখন উৎপাদন সক্ষমতা অলস বসে থাকায় পরিচালন ব্যয় ও ঋণের কিস্তি মেটাতে প্রস্তুতকারকদের মূল্যছাড়ের প্রতিযোগিতায় নামতে হচ্ছিল।
“দেশীয় প্রস্তুতকারকদের জন্য এটি একটি মাইলফলক সিদ্ধান্ত,” মন্তব্য করে রশীদ বলেন, “স্থানীয়ভাবে তৈরি টাইলস বাংলাদেশের আবহাওয়ার কথা মাথায় রেখে তৈরি করা হয় এবং এগুলো স্থায়িত্বের দিক থেকে অনেক সময় আমদানিকৃত পণ্যের চেয়েও ভালো। আমদানি কমলে দেশীয় পণ্যের চাহিদা বাড়বে এবং বাজার স্থিতিশীল হবে।”
একই সুর মিলিয়ে বিআরবি ক্যাবল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের মার্কেটিং ও সেলস ডিরেক্টর মো. রফিকুল ইসলাম রনি বলেন, নির্মাণসামগ্রী খাতের দেশীয় উৎপাদকদের জাতীয় চাহিদা মেটানোর পূর্ণ সক্ষমতা রয়েছে।
“আমদানির বদলে স্থানীয় পণ্য ব্যবহার করা হলে টাকা দেশের ভেতরেই থাকবে, রাজস্ব বাড়বে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং সার্বিক শিল্পখাত প্রসারিত হবে,” রনি বলেন। একইসঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, স্থানীয় পণ্যের মান অনেক সময় বিদেশি পণ্যের চেয়েও উন্নত।

