বাংলাদেশকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের (১ হাজার বিলিয়ন মার্কিন ডলার) দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক লক্ষ্যে নিয়ে যেতে বর্তমান সুদের হারভিত্তিক মুদ্রানীতি কাঠামো থেকে ধীরে ধীরে সরে এসে ‘মূল্যস্ফীতি লক্ষ্যভিত্তিক’ নতুন কাঠামো গড়ে তুলতে চায় বাংলাদেশ ব্যাংক।
রোববার জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির প্রথম বৈঠকে উপস্থাপন করা লিখিত প্রবন্ধে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ অবস্থানের কথা জানানো হয়। বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. হাবিবুর রহমান ‘বাংলাদেশ ব্যাংক এবং মুদ্রানীতি’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন তুলে ধরেন।
অর্থ মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির সভাপতি মুশফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে আয়োজিত এ বৈঠকে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আহসান হাবিব, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানসহ কমিটির সদস্য ও পদস্থ কর্মকর্তারা অংশ নেন।
কেন দরকার নতুন কাঠামো?
বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার (পলিসি রেট) বাড়ানো বা কমানোর মাধ্যমে বাজারে অর্থের প্রবাহ ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করে, দীর্ঘমেয়াদে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের বৃহৎ অর্থনীতি গড়তে ১৯৭২ সালের ‘বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার’ সংশোধন করে ব্যাংককে আরও স্বাধীন, আধুনিক ও যুগোপযোগী করা প্রয়োজন।
সুদের হারভিত্তিক বনাম মূল্যস্ফীতি লক্ষ্যভিত্তিক কাঠামো:
বর্তমান ব্যবস্থা (সুদের হারভিত্তিক): নীতি সুদহার বাড়িয়ে (বর্তমানে ১০ শতাংশ) ঋণের খরচ বাড়িয়ে দেওয়া হয়, যাতে মানুষ ঋণ কম নেয় এবং বাজারে অর্থের জোগান কমে।
প্রস্তাবিত ব্যবস্থা (মূল্যস্ফীতি লক্ষ্যভিত্তিক): কেন্দ্রীয় ব্যাংক শুরুতেই একটি নির্দিষ্ট মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য (যেমন: ৫ শতাংশ) নির্ধারণ করবে। পরবর্তীতে সুদের হার, তারল্য, বিনিময় হারসহ সব অর্থনৈতিক নীতি সেই নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের জন্য পরিচালিত হবে।
উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও সংসদ সদস্যদের উদ্বেগ
টানা কয়েক মাস ধরে দেশে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে রয়েছে (গত জুনে ছিল ৯.১৬ শতাংশ)। আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, দুর্বল সরবরাহ ব্যবস্থা এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
বৈঠক শেষে কমিটির সভাপতি মুশফিকুর রহমান জানান, কমিটির প্রায় সব সদস্যই উচ্চ সুদের হার এবং মূল্যস্ফীতি না কমা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। বিশেষ করে, উৎপাদনশীল খাতের চাকা সচল রাখতে এবং ব্যবসা পরিচালনা সহজ করতে ব্যাংকের সুদের হার এক অঙ্কে (সিঙ্গেল ডিজিট) নামিয়ে আনার দাবি জানান সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন।
ঐতিহাসিক রূপান্তর ও শর্তাবলী
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠার পর থেকে মুদ্রানীতি পরিচালনায় বেশ কিছু পরিবর্তন এসেছে:
২০০৩ সাল পর্যন্ত: সরাসরি নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা ও অর্থের জোগানভিত্তিক পদ্ধতি।
১ জুলাই ২০২৩: চালু হয় সুদের হার করিডোরভিত্তিক নতুন মুদ্রানীতি।
ভবিষ্যৎ রূপরেখা: সরাসরি মূল্যস্ফীতি লক্ষ্যভিত্তিক কাঠামোর গ্রহণ।
তবে এই নতুন কাঠামো পুরোপুরি বাস্তবায়নের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত স্বাধীনতা, মূল্যস্ফীতির নির্ভুল পূর্বাভাস দেওয়ার সক্ষমতা, বাজারভিত্তিক বিনিময় হার এবং রাজস্ব নীতির সঙ্গে মুদ্রানীতির কঠোর সমন্বয় নিশ্চিত করা জরুরি বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

